আপনি যে টপিক্সটি সম্পর্কে জানতে চান এর উপর ক্লিক করুন অথবা পড়া চালিয়ে যান-
[ez-toc]
পোস্ট আপডেট টাইমঃ ১২ ফেব্রুয়ারী ২০২৪ খ্রি.
১। ফিজিওথেরাপি কীঃ
ফিজিওথেরাপি হলো একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা পদ্ধতি। শাব্দিক ভাবে ফিজিও (শারীরিক) ও থেরাপি (চিকিৎসা)- এ দু’টি শব্দ থেকে এসেছে ফিজিওথেরাপি (Physiotherapy)।
ফিজিওথেরাপি আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক অন্যতম এবং একটি অপরিহার্য শাখা।
এটি একটি স্বতন্ত্র চিকিৎসাব্যবস্থা, যেখানে শারীরিক ব্যায়ামের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়। শুধু ওষুধ সব রোগের পরিপূর্ণ সুস্থতা দিতে পারে না। বিশেষ করে বিভিন্ন মেকানিক্যাল সমস্যা থেকে যে সব রোগের সৃষ্টি হয়, তার পরিপূর্ণ সুস্থতা লাভের উপায় ফিজিওথেরাপি। ফিজিওথেরাপিস্টরা মানবদেহের চলন ও কার্যপ্রণালীর উন্নয়ন, সর্বোচ্চ নড়ন ও চলনব্যাপ্তি, ব্যথা নিয়ন্ত্রণ ও নিরাময় এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যার প্রতিকার ও নিরাময় করে থাকেন। এ ধরণের চিকিৎসা পদ্ধতির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো- এই পদ্ধতিতে ওষুধ প্রয়োগের পরিবর্তে শারীরিক ব্যায়ামের মাধ্যমে রোগ নিরাময় ও প্রতিকার করা হয়।
যেখানে একজন ফিজিওথেরাপিস্ট রোগীর সব কথা শুনে-বুঝে, রোগীকে ভালোভাবে দেখে এবং প্রয়োজনে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগীর সঠিক রোগ, আঘাত বা অঙ্গ বিকৃতির ধরন নির্ণয় করে রোগীকে বিভিন্ন ধরনের ফিজিক্যাল মেথড যেমন ম্যানুয়াল টেকনিক, তাপ ও ব্যায়ামের মাধ্যমে চিকিৎসা করে থাকেন।
সড়ক দুর্ঘটনা, শারীরিক প্রতিবন্ধতা, বিকলাঙ্গতা, পক্ষাঘাত ও বড় কোনো অস্ত্রোপচারের পর রোগীর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপির ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাছাড়া বিভিন্ন ধরনের বাত, মাথা, ঘাড়, কাঁধ, পিঠ, কোমর ও হাঁটুর ব্যথায় এবং স্পোর্টস ইনজুরিতে ফিজিওথেরাপি বিশ্বব্যাপী একটি স্বীকৃত চিকিৎসাব্যবস্থা।
এ পদ্ধতির চিকিৎসকরা ফিজিওথেরাপিস্ট নামে পরিচিত।
(ফিজিওথেরাপি ও এর বিস্তারিত, এ পোস্টটি শেয়ার করা যেতে পারে)
২। ফিজিওথেরাপি’র সূচনা:
ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা নতুন কোন চিকিৎসা পদ্বতি নয়। প্রাচীন গ্রীসে হিপোক্রেটাস ম্যাসেজ ও ম্যানুয়াল থেরাপি দ্বারা ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার সূচনা করেছিলেন। খ্রিস্টপূর্ব ৪৬০ সালে হেক্টর ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার একটি শাখা ব্যবহার করতেন যাকে বর্তমানে হাইড্রোথেরাপী বলা হয়। তথ্য-উপাত্ত অনুসারে ১৮৯৪ সালে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার বর্তমান ধারা অর্থাৎ ম্যানুয়াল থেরাপি, ম্যানিপুলেটিভ থেরাপি, এক্সারসাইজ থেরাপি, হাইড্রোথেরাপি, ইলেক্ট্রোথেরাপি ইত্যাদি প্রবর্তন করা হয়। নিউজিল্যান্ডে ১৯১৩ এবং আমেরিকাতে ১৯১৪ সালে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা শুরু হয়।
৩। ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা সম্পর্কে বিশ্ব-সাস্থ্য-সংস্থাঃ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা WHO-এর নির্দেশনা অনুযায়ী ফিজিওথেরাপি বা ফিজিক্যাল থেরাপি হলো এমন একটি চিকিৎসা ব্যবস্থা যা সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং একজন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক স্বতন্ত্রভাবে রোগীর রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসাব্যবস্থা প্রদান করতে পারেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ওয়ার্ল্ড কনফেডারেশন ফর ফিজিক্যাল থেরাপি (ডব্লিউসিপিটি)-এর মতে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক প্রফেশনাল ডিগ্রিধারীরাই ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপিস্ট এবং স্বাধীনভাবে চিকিৎসা সেবা প্রদান করতে পারেন।
(ফিজিওথেরাপি ও এর বিস্তারিত, এ পোস্টটি সম্পর্কে মন্তব্য করতে পারেন)
৪। কেন এই ফিজিওথেরাপি :
আমরা যদি আমাদের শরীরের বিভিন্ন রোগের কথা চিন্তা করি তাহলে দেখতে পাব যে, শুধুমাত্র ঔষধ সব রোগের পরিপুর্ণ সুস্থতা দিতে পারে না। বিশেষ করে যে সব রোগের উৎস বিভিন্ন মেকানিক্যাল সমস্যা সেসব ক্ষেত্রে ঔষধের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে কম। যেমন: বাত – ব্যথা, স্পোর্টস ইনজুরি, হাড় ক্ষয় জনিত রোগ, জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া, স্ট্রোক, প্যারালাইসিস ইত্যাদি। তাহলে এসব রোগ হতে পরিপুর্ণ সুস্থতা লাভের উপায় কি?
বর্তমানে উন্নত বিশ্বে সব ধরনের শারিরীক সমস্যার পরিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক নতুন ধারার প্রবর্তন হয়েছে। যাকে বলা হয় মাল্টি ডিসিপ্লিনারি টিম। এই টিমে থাকেন সার্জন, মেডিসিন স্পেশালিষ্ট, জেনারেল ফিজিশিয়ান, ফিজিওথেরাপিষ্ট, অকুপেশনাল থেরাপিষ্ট, নার্স, সোশ্যাল ওয়ার্কার। রোগীর শারিরীক সমস্যা দুর করে কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপিষ্টের ভূমিকা অপরিসীম। স্ট্রোক, আঘাত অথবা অপারেশন বা শল্যচিকিৎসায় স্নায়ুতন্ত্রের জটিলতায় ভুগে পঙ্গুত্ব বরণ করে অনেকে। এ ধরনের রোগীর শরীর অবশ হয়ে যায় বা মাংসপেশি শক্ত হয়ে যায়। এসব রোগীর শরীরের কর্মক্ষমতা বাড়ানো এবং অস্থিসন্ধি সচল রাখা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ে। এদের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনায় সক্ষম করে তুলতে ফিজিওথেরাপির বিকল্প নেই।
(ফিজিওথেরাপি ও এর বিস্তারিত, এ পোস্টটি শেয়ার করা যেতে পারে)
৫। ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তাঃ
যান্ত্রিক জীবনে মানুষ যখন নিজেকে যন্ত্রের মত ব্যস্ত রাখে, স্বভাবতই তার যান্ত্রিক জীবনে দুর্ঘটনা একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়; তাই মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে হাড়, জোড়া, মাংসপেশী, নার্ভ টেনটন, লিগামেন্ট, বাত ব্যথা, প্যারালাইসিস সহ বিভিন্ন আঘাত জনিত সমস্যায়। এই সকল সমস্যা থেকে পুরোপুুরি নিজেকে সুস্থ্য করতে অবশ্যই ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা অপরিহার্য। দীর্ঘমেয়াদি রোগ, বিশেষ করে বাত-ব্যথা ও পক্ষাঘাতের রোগীদের সমস্যা ওষুধ দিয়ে নিরাময় সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা।
৬। কাকে ফিজিওথেরাপিষ্ট বলা যাবে এবং কে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা দেয়ার জন্য উপযুক্ত :
ফিজিওথেরাপিতে শুধুমাত্র ব্যাচেলর অথবা পোষ্ট গ্রাজুয়েশন ডিগ্রিধারীকেই ফিজিওথেরাপিষ্ট বলা যাবে। বর্তমানে আমাদের দেশে বিভিন্ন মানের ফিজিওথেরাপিষ্ট আছেন। যেমন-
(ক) কোয়ালিফাইড ফিজিওথেরাপিস্ট: কোয়ালিফাইড ফিজিওথেরাপিস্ট হতে চাইলে কমপক্ষে ৪ বছরের কোর্স ও ১ বছরের ইন্টার্নশিপসহ ফিজিওথেরাপি বিষয়ে ব্যাচেলর বা স্নাতক ডিগ্রি গ্রহণ করতে হবে। শুধুমাত্র ফিজিওথেরাপি বিষয়ে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীকেই ‘ফিজিওথেরাপিস্ট’ বলা হয়ে থাকে।
(খ) ডিপ্লোমা ফিজিওথেরাপিস্ট: যিনি ফিজিওথেরাপি বিষয়ে ৩ বছরের ডিপ্লোমা কোর্স করেছেন, তাকে ডিপ্লোমা ফিজিওথেরাপিস্ট বলা হয়। তিনি একজন কোয়ালিফাইড ফিজিওথেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাসেবা প্রদান করতে পারবেন।
(গ) অ্যাসিস্ট্যান্ট ফিজিওথেরাপিস্ট: মাত্র ১ বছরের কোর্স সম্পন্ন করে অ্যাসিস্ট্যান্ট ফিজিওথেরাপিস্ট হওয়া যায়। তবে একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট ফিজিওথেরাপিস্টকে অবশ্যই একজন কোয়ালিফাইড ফিজিওথেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা দিতে হবে।
(ফিজিওথেরাপি ও এর বিস্তারিত, এ পোস্টটি সম্পর্কে মন্তব্য করতে পারেন)
৭। একজন ফিজিওথেরাপিস্টকে কী কী বিষয়ে জ্ঞান রাখতে হয়ঃ
ফিজিওথেরাপি যেহেতু চিকিৎসা বিজ্ঞানের অঙ্গ তাই একজন ফিজিওথেরাপিস্টকে জানতে হয় স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের প্রায় অনেক বিষয়ে। এরা অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, প্যাথলজি, সাইকোলজি, ফার্মাকোলজি, কাইলোসিওলজী, অর্থোপেডিক্স, রিউমাটোলজি সম্বন্ধে যথেষ্ট জ্ঞান রাখেন বা রাখতে হয়; আর এই জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে একজন রোগীকে বন্ধু সুলভ আচরণ করে পুরোপুরি সুস্থ করে তোলেন একজ ফিজিওথেরাপিস্ট।
৮। একজন ফিজিওথেরাপিস্ট কিভাবে রোগিকে সুস্থ করে তুলেনঃ
একজন ফিজিওথেরাপিস্ট বিজ্ঞান সম্মত উপায়ে আস্তে আস্তে হাত ও পায়ের শক্তি বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের ব্যায়াম করে থাকেন। তারপর দেয়া হয় শরীরের ভারসাম্যের প্রশিক্ষণ ও হাঁটার শিক্ষা যা রোগীকে স্বনির্ভর করে তোলে। হাতের ক্ষেত্রেও যত্ন নেয়া হয় ফাংশনাল কাজকর্মের।
সবার জীবনে বার্ধক্য হচ্ছে অবধারিত আর এ সময় সে বিভিন্ন ব্যথায় আক্রান্ত হয়। দেখা দেয় শারীরিক দুর্বলতা। এসব অসহায় মানুষের সুস্থতার জন্য ফিজিওথেরাপির গুরুত্ব অপরিসীম। উন্নত বিশ্বে এমন সুযোগ সুবিধা সবাই পায়; কারণ বৃদ্ধ বয়সে প্রায় প্রত্যেকেই পুনর্বাসন কেন্দ্রে থেকে চিকিৎসা নিয়ে থাকে। একজন মানুষ অসুস্থ হওয়ার পরে যদি ভাল চিকিৎসা নেয় তাহলে সে উক্ত সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পারে।
তবে যদি সে সেই সমস্যা কাটিয়ে আগের কাজে ফিরে আসতে না পারে, তাহলে সেই চিকিৎসা পরিপূর্ণ হল না। যেমন একজন লোকের হাত বা পায়ে আঘাত পেয়েছে। আঘাতের জন্য তাকে অপারেশন করতে হলো। সে অপারেশন করেও ফেললেন কিন্তু অপারেশনের পর সেই লোকটি হাত দিয়ে আগের মত কাজ করতে পারে না বা হাঁটু ভাঁজ করে বসতে পারে না। উক্ত রোগীর সঠিক সময়ে সঠিক ভাবে পুনর্বাসন করা হয় নি বলে সে আর আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারল না।
তাই একজন রোগীর পুরোপুরি চিকিৎসা সহ পুনর্বাসন করতে দরকার একটি মেডিক্যাল টিম, যে টিমে চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত থাকবে সবাই। দুঃখের বিষয় হল, আমাদের দেশে অনেক বড় বড় বিশেষায়িত হাসপাতালে এমনকি প্রায় সবগুলো সরকারি হাসপাতালেও এখনো চিকিৎসা ডিসিপ্লিনারী টিমে ফিজিওথেরাপিস্ট নাই। যার ফলে একজন রোগীর সঠিক চিকিৎসায় একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যাচ্ছে।
কারণ একটি মাল্টিডিসিপ্লিনারী টিমে থাকা একজন ফিজিওথেরাপিস্ট বিভিন্নভাবে এ্যাসেসমেন্ট করে রোগীর মানসিক ও শারীরিক অবস্থার উন্নতি করে, যা রোগীকে পুরোপুরি সুস্থ হতে সহায়তা করে। তাই বলা যায় একজন বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপিস্ট তার দক্ষতা দিয়ে যে ফিজিওথেরাপি প্রদান করে তা রোগীর জন্য একান্ত জরুরী।
(ফিজিওথেরাপি ও এর বিস্তারিত, এ পোস্টটি শেয়ার করা যেতে পারে)
৯। ফিজিওথেরাপি সেন্টারের ম্যানেজার, ফিজিওথেরাপিস্ট, এসিস্ট্যান্ট সহ সকল কর্মকর্তা-কর্মচারির আচরণ বিধি:
ফিজিওথেরাপি সেন্টারের ম্যানেজার, ফিজিওথেরাপিস্ট ও এর সহকারী সহ সকল কর্মচারিকে মনে রাখতে হবে, মানুষ কখনো যন্ত্র বা জড় পদার্থ নয় যে, তাকে মেশিন পত্রের মতো ঠিক করা যাবে। আপনারা রোগিকে ব্যায়াম করাবেন, তার শরীরে ম্যাসেজ করবেন, বিভিন্ন মেশিনপত্রের মাধ্যমে তাকে ইলেকট্রো থেরাপি প্রদান করবেন ঠিকই, কিন্তু আপনাদের সকলের মন, মগজ ও আচরণ বিধিতে মিশে থাকতে হবে, মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব; তাকে সম্মান করা, তাকে ভালোবাসা, তার সাথে নমনীয় ব্যবহার করা; এটা মানুষ হিসেবে আপনার মৌলিক ও ঈমানী দায়িত্ব এবং ইহাই রোগ মুক্তির অন্যতম শর্ত। আর যদি আপনি শুধু অর্থ ইনকাম করতে চান বা আপনার মেজাজ শুধু ভাঙ্গা-গড়ার কারিগর হয়, মানুষের শরীরে ম্যাসেজ চালানো বা তাকে ধরে উঠানো, বিছানায় শোয়ানো ইত্যাদিকে আটা আর ময়দার বস্তার মতো মনে হয় (আল্লাহ মাফ করুক); তাহলে প্রিয় ভাই আপনি এ পেশায় আসবেন না, বাস ড্রাইভিং থেকে শুরু করে অনেক পেশাই এ সমাজে বিদ্যমান রয়েছে। আপনি সে সব পেশায় চলে যান। কারণ স্বভাবতো আর আপনার সৃষ্ট নয়, এটা আল্লাহর সৃষ্ট। এতে আপনার কোন দোষ নেই। আপনি স্বসম্মানে এ পেশা ছেড়ে দেন।
দেখুন, রোগীর শরীরে হাত দেয়া ও তার সাথে ব্যবহার করায় আপনাকে খুবই সতর্ক হতে হবে। রোগীকে এমন মমতা মাখা নরম ব্যবহার করতে হবে ও আলতো ভাবে ধরতে হবে বা তাকে ব্যায়াম বা তার শরীরে ম্যাসেজ করতে হবে যে এবং তার সাথে এমন বন্ধুত্বপুর্ণ আন্তরিক ব্যবহার করতে হবে যে, যেন রোগীর অর্ধেক থেরাপি এর মাঝেই হয়ে যায়।
অন্যদিকে প্রত্যেক থেরাপি সেন্টারে যে সব কর্মকর্তা কর্মচারী থাকবেন, আপনারা নিজেদের মাঝে পরস্পরে বন্ধুত্বপুর্ণ আন্তরিক ব্যবহার করবেন। থেরাপি সেন্টারের মধ্যে অতিরিক্ত মোবাইল বাজানো; মোবাইল আসক্তি বা মোবাইলে এটা সেটা খেলা এসব বন্ধ রাখবেন। প্রত্যেক কর্মচারীকে অবশ্যই চেইন অব কমান্ড (একধাপ উপরস্থ কর্মচারীকে মান্য করা) মেনে চলতে হবে।
যেহেতু এটা একটি চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠান, আর আপনাদের নিজেদের মাঝেই যদি কোনরুপ নমনীয়তা, ত্যাগ, পারস্পরিক সম্মানবোধ, গুড আন্ডারস্ট্যান্ডিং ও রিলেশনশীপ না থাকে, তাহলে রোগীদেরকে আপনারা কী সেবা দিবেন বা দিতে পারবেন? রোগীদের মনস্তত্বে কী আপনাদের এসব বৈপরীত্ব ব্যবহার নেগেটিভ রিয়েকশান করে না? আপনাদেরকে খুব ভালো করে মনে রাখতে হবে, থেরাপি সেন্টারের বা একটি চিকিৎসালয়ের সকল কর্মচারীর শান্তিপূর্ণ, বন্ধুত্বপূর্ণ ও আন্তরিকতাময় সহ অবস্থান; এগুলোও কিন্তু একজন রোগীকে সুস্থ করার পথে, রোগিদেরকে চিকিৎসা সেবা দেয়ার উপযুক্ত স্থান হিসেবে বিবেচনার বিষয় হিসেবে, তথা আপনার ফিজিওথেরাপি সেন্টারের সফলতারই অংশ হিসেবেই বিবেচ্য হবে।
(ফিজিওথেরাপি ও এর বিস্তারিত, এ পোস্টটি সম্পর্কে মন্তব্য করতে পারেন)
১০। একজন মানুষের কখন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা নেয়া প্রয়োজনঃ
সাধারণত মানুষের নিম্নোক্ত সমস্যা সমূহে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা গ্রহণ করার প্রয়োজন পড়ে। যেমন-
(ক) অর্থোপেডিক সমস্যা
ঘাড়/কোমর/মেরুদণ্ডের ব্যথা, সায়াটিকার সমস্যা, কাঁধের ব্যথা/ফ্রোজেন সোল্ডার, টেনিস এলবো, গোড়ালির ব্যথা, অপারেশন-পরবর্তী সমস্যাসহ যেকোনো ধরনের মাস্কুলোস্কেলেটাল ব্যথায় ফিজিওথেরাপি কার্যকর ভূমিকা পালন করে
(খ) নিউরোলজিক্যাল সমস্যা
যেকোনো ধরনের নিউরোলজিক্যাল সমস্যায় রোগীকে পূর্বের কার্যক্ষম জীবনে ফিরতে ফিজিওথেরাপির বিকল্প নেই। স্ট্রোক, মুখ বেঁকে যাওয়া, পারকিনসন্স, মটর নিউরন ডিজিজ, জিবিএস, স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি, মায়লোপ্যাথি, নিউরোপ্যাথিতে ফিজিওথেরাপির বিকল্প কোনো চিকিৎসা নেই।
(গ) জেরিয়াট্রিক সমস্যা বা প্রবীণ নাগরিকদের চিকিৎসায়
উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের দেশের মানুষের গড় আয়ু অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বর্তমানে ৭৩ বছর। যে প্রবীণ নাগরিকরা বিভিন্ন ধরনের বাত, ব্যথা ও শারীরিক অক্ষমতায় ভোগেন তাদের চিকিৎসা ও সুস্থতায় ফিজিওথেরাপি গুরুতপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
(ঘ) পেডিয়াট্রিক সমস্যা
অটিজম, সেরিব্রাল পালসি, ডাউন সিনড্রোম, জন্মগত বিকলাঙ্গতা, ক্লাব ফুটসহ যেকোনো প্রতিবন্ধিতায় ফিজিওথেরাপি প্রয়োজন, যা আপনার প্রিয় শিশুটিকে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন দিতে পারে।
(ঙ) স্পোর্টস ফিজিওথেরাপি
একজন অভিজ্ঞ ফিজিও ব্যতীত যেকোনো ধরনের স্পোর্টস ইভেন্ট কল্পনা করা সম্ভব নয়, সফট টিস্যু ইনজুরিসহ যেকোনো ধরনের স্পোর্টস ইনজুরিতে আপনি সরাসরি একজন অভিজ্ঞ ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে পারেন।
(চ) কার্ডিও-রেসপিরেটরি সমস্যায় ফিজিওথেরাপি
দেশে কোভিড মহামারির সময় দেখছেন কিভাবে একজন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক আইসিইউ, এইচডিউ-তে রোগীদের জীবন বাঁচিয়েছেন। করোনা, টিবি, সিওপিডি, ব্রঙ্কাইটিস, অ্যাজমা, কার্ডিয়াক অপারেশনসহ শ্বাসযন্ত্রের বিভিন্ন জটিলতায় রোগীর সুস্থতায় ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা প্রয়োজন।
(ছ) গাইনোকোলজিক্যাল সমস্যায় ফিজিওথেরাপি
বর্তমানে নরমালভাবে সন্তান প্রসব করতে একজন মায়ের সঠিক থেরাপিউটিক এক্সারসাইজ প্রয়োজন, যেটা শুধু একজন স্পেশালিস্ট ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকই করতে পারেন। এ ছাড়া গর্ভাবস্থায় বিভিন্ন ব্যথা, প্রসব-পরবর্তী বিভিন্ন জটিলতায় ফিজিওথেরাপি কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
(ফিজিওথেরাপি ও এর বিস্তারিত, এ পোস্টটি শেয়ার করা যেতে পারে)
১১। একজন ফিজিওথেরাপিস্ট যে পদ্ধতি অবলম্বন করে রোগিকে ফিজিওথেরাপি সেবা প্রদান করে থাকেনঃ
একজন ফিজিওথেরাপিষ্ট রোগীর রোগ বর্ণনা, ফিজিক্যাল টেষ্ট, ফিজিওথেরাপিউটিক স্পেশাল টেষ্ট, প্রয়োজন সাপেক্ষে বিভিন্ন রেডিওলজিক্যাল টেষ্ট এবং প্যাথলজিক্যাল টেষ্ট এর মাধ্যমে রোগ নির্ণয় বা ডায়াগ্নোসিস করে থাকেন। অত:পর রোগীর সমস্যানুযায়ী চিকিৎসার পরিকল্পনা অথবা ট্রিটমেন্ট প্লান করেন এবং সেই অনুযায়ী নিন্মোক্ত পদ্ধতিতে ফিজিওথেরাপি সেবা প্রদান করে থাকেন।
-ম্যানুয়াল থেরাপি
-ম্যানিপুলেটিভ থেরাপি
-মোবিলাইজেশন
-মুভমেন্ট উইথ মোবিলাইজেশন
-থেরাপিউটিক এক্সারসাইজ
-ইনফিলট্রেশন বা জয়েণ্ট ইনজেকশন
-পশ্চারাল এডুকেশন
-আরগোনমিক্যাল কনসালটেন্সী
-হাইড্রোথেরাপি
-সাইকোথেরাপি
-ইলেকট্রোথেরাপি বা অত্যাধুনিক মেশিনের সাহায্যে চিকিৎসা (যেমন: SWD, MWD ,TENS, IRR, Traction, MST, EST, ICE, SHOCKWAVE THERAPY, SHORTWAVE THERAPY, Exercise/Rehabilitation ইত্যাদি)।
১২। যেসব রোগে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা দেয়া হয় বা যে সব ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা অত্যাবশ্যক:
✔বাত-ব্যথা
✔ কোমড় ব্যথা (বিনা অপারেশনে মেরুদণ্ডের ডিস্কের চিকিৎসা)
✔ ঘাড় ব্যথা
✔কাঁধ ব্যথা
✔ হাঁটু অথবা গোড়ালীর ব্যথা
✔আঘাত জনিত ব্যথা
✔হাড় ক্ষয় জনিত রোগ
✔জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া
✔স্ট্রোক
✔প্যারালাইসিস জনিত সমস্যায়
✔মুখ বেঁকে যাওয়া বা ফেসিয়াল পালসি
✔টিস্যু বা মাংসপেশিগত সমস্যা
✔শরীরের যে কোন জয়েন্ট ব্যথা
✔মেরুদন্ডে ব্যথা বা ধরা বা সোজা করতে না পারা
✔মাথা সামনে থেকে ডানে বাঁয়ে ফিরাতে না পারা
✔হাত-পা ঝিন ঝিন করা
✔বাক জড়তা
✔অটিজম বা নিউরো সমস্যা
✔বিভিন্ন ধরনের অপারেশন পরবর্তী সমস্যায়
✔আইসিইউ (ওঈট) তে অবস্থানকারী রোগীর জন্য
✔পা বাঁকা (ক্লাবফিট)
✔গাইনোকলজিক্যাল সমস্যায়
✔সেরিব্রাল পলসি (প্রতিবন্ধী শিশু)
✔বার্ধক্যজনিত সমস্যা ইত্যাদি চিকিৎসার ক্ষেত্রে ও পুনর্বাসন সেবায় ফিজিওথেরাপির ভূমিকা অপরিসীম।
(ফিজিওথেরাপি ও এর বিস্তারিত, এ পোস্টটি সম্পর্কে মন্তব্য করতে পারেন)
১৩। ডায়বেটিসে ফিজিওথেরাপিঃ
যাদের ডায়বেটিস রয়েছে, তাদেরও ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা নেয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। যেমন-
টাইপ ২ ডায়বেটিস প্রতিরোধ এবং প্রতিকারের জন্য এক্সারসাইজ হল একটা প্রধান মেডিসিন । একজন ফিজিওথেরাপিস্ট একজন এক্সারসাইজ বিশেষজ্ঞ । একমাত্র কেবল তিনিই পারেন সঠিক, নিরাপদ এবং কার্যকরী এক্সারসাইজ সাজেস্ট করতে ।
এছাড়া একজন ডায়বেটিস রোগী বিভিন্ন ধরনের অস্টিওআর্থাইটিস জনিত হাঁটু ব্যথা, কোমর ব্যথা, ডায়বেটিস নিউরোপ্যাথি সহ বিভিন্ন ধরনের ব্যথায় ভুগতে থাকে । অনেক ডায়বেটিস রোগীকে এম্পুটেশন করতে (পা কেটে ফেলা) হয় । পরবর্তীতে সঠিক পুনর্বাসনের জন্য ফিজিওথেরাপির গুরুত্ব অপরিসীম ।)
১৪ । বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসাঃ
আমেরিকান চিকিৎসক আর জে গ্রাস্টের সহায়তায় যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য ১৯৭২ সালে আন্তর্জাতিক ফিজিওথেরাপিস্টদের দ্বারা এ দেশে প্রথম ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার সূচনা হয়।
১৯৭২ সালে এ দেশে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা পেশার সূচনা হলেও ২০১৮ সাল পর্যন্ত ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকদের কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা ছিল না এ দেশে। ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদে ‘বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল’ আইন পাস হয়, যেখানে স্টেক হোল্ডার হিসেবে বিশ্ব ফিজিওথেরাপি সংস্থা নিবন্ধিত বাংলাদেশের ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকদের জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশ ফিজিওথেরাপি অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ) সরকারকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করেন। এই উদ্যোগের নেপথ্যে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন প্রধানমন্ত্রীকন্যা অটিজম বিশেষজ্ঞ সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। বর্তমানে বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল (বিআরসি) ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকসহ রিহ্যাবিলিটেশন প্রফেশনালদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
বাংলাদেশ ফিজিওথেরাপি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, দেশে প্রায় তিন হাজারের মতো ফিজিওথেরাপিস্ট রয়েছে। শুধু ঢাকাতেই রয়েছে ২ হাজার ৩০০-এর মতো বেসরকারি ফিজিওথেরাপি সেন্টার। তবে বেসরকারিভাবে গড়ে ওঠা সিআরপিসহ দেশের প্রতিটি স্পেশালাইজড প্রাইভেট হাসপাতালেই ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক এবং ফিজিওথেরাপি বিভাগ রয়েছে, কিন্তু যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। দেশের রোগীদের সঠিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রত্যেক সরকারি হাসপাতালে সহ প্রতিটি বেসরকারি ও প্রাইভেট হাসপাতালে ফিজিওথেরাপি অফিসার নিয়োগ প্রদান জরুরি।
১৫। ফিজিওথেরাপির নামে অপচিকিৎসাঃ
শুধু তাপ বা মেশিন দেয়ার নামই ফিজিওথেরাপি নয়, ফিজিওথেরাপি একটি স্বতন্ত্র এবং পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ব্যবস্থা। ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার পূর্বশর্ত সেখানে একজন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক থাকতে হবে, যার তত্ত্বাবধানে আপনি চিকিৎসা নেবেন। এখনো বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল বাস্তবায়ন না হওয়ায় যত্রতত্র ফিজিওথেরাপির নামে ভুয়া প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যেখানে কোনো ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক তো নেই-ই, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ফিজিওথেরাপি) নেই, তাই সেখানে রোগীরা চিকিৎসা নিয়ে সুস্থতার পরিবর্তে জীবন ও স্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অপচিকিৎসা রোধে এবং প্রফেশনাল উন্নয়নে দ্রুত বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ সরকারের উচিৎ হবে, ফিজিওথেরাপি, এ চিকিৎসা সেবাকে মানুষের নিকট ঝুঁকি ও ত্রুটিমূক্ত এবং উপযুক্ত বা সহজলভ্য করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
একজন রোগি বা রোগীর অভিভাবকের উচিৎ হবে, ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা নেয়ার আগে তার চিকিৎসক ব্যাচেলর অব ফিজিওথেরাপি সম্পন্ন কি না (?), তা জেনে নেয়া। নিশ্চিত হয়েই চিকিৎসা নিন ও সুস্থ থাকুন। একজন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকের কাছ থেকে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা নিলে আপনার শরীর ও স্বাস্থ্যের ক্ষতি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
(ফিজিওথেরাপি ও এর বিস্তারিত, এ পোস্টটি শেয়ার করা যেতে পারে)
১৬। ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা নেয়ার ক্ষেত্রে রোগী বা তার অভিভাবকের সাবধানতা অবলম্বনঃ
ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা একটি বিজ্ঞানসম্মত ও সুপ্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা পদ্ধতি যা আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত। আমাদের দেশসহ বিভিন্ন দেশে ফিজিওথেরাপিষ্টগণ ফার্স্ট কন্ট্যাক প্রাকটিশনার হিসেবে চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছেন। তবে আমারদের দেশে এই চিকিৎসা সেবাটি বিভিন্ন মহলের অপপ্রচার (ব্যায়াম ও স্যাক) ও অপব্যবহার (কোয়ালিফাইড ফিজিওথেরাপিষ্ট ছাড়া অন্য কোন চিকিৎসক কর্তৃক ফিজিওথেরাপি পরামর্শ দেয়া) এর কারনে সাধারণ মানুষ সঠিক চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
তাই আপনার ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার পরামর্শ যে চিকিৎসকই করুক না কেন , অবশ্যই বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপিষ্টের নিকট ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা গ্রহন করুন ।
দীর্ঘদিন ধরে ফিজিওথেরাপি নিয়েও সুফল পাওয়া যাচ্ছে না বরং সমস্যা আরও বাড়ছে- সম্প্রতি অনেক রোগী এমন অভিযোগ করেছেন। রোগীদের অভিযোগের চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে- ইলেকট্রোথেরাপি প্রয়োগের ফলে অনেকের শরীর পুড়ে গেছে। (রোগি এবং চিকিৎসককে এ বিষয়ে সতর্ক হতে হবে যে, কখন তাপ সহ্য ক্ষমতার বাহিরে চলে যাচ্ছে। এ অবস্থা পরিলক্ষিত হওয়ার পর পরই বিষয়টি ফিজিওথেরাপিস্ট স্যারকে বলতে হবে ও তাপ প্রয়োগ থেরাপিকে নিয়ন্ত্রণ বা মুভ করতে হবে বা একেবারে বন্ধই করে দিতে হবে। কী করতে হবে তা ফিজিওথেরাপি স্যার সিদ্ধান্ত নিবেন) ট্রাকশন দেওয়ার পর ব্যথা আরও তীব্রতর হয়েছে। অনেক প্যারালাইসিস রোগীর
শোল্ডার ডিসলোকেশন হয়ে গেছে। এ সব বিষয়ের কারণে রোগীরা ভুল বার্তা পাচ্ছেন। ফিজিওথেরাপি পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া মুক্ত নয় অথবা অকার্যকরও নয়।
আসলে বিষয়টি তা নয়। এ বিষয়ে রোগী ও তাদের স্বজনদের সচেতন হতে হবে। ফিজিওথেরাপি সাধারণ কোনো বিষয় নয়। সচেতন না হলে আপনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। অনেক অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত মানুষ মুনাফার আশায় কম মূল্যে নিম্নমানের দেশি যন্ত্রপাতি নিয়ে একটি থেরাপি সেন্টার খুলেছেন। সচেতন না হয়ে এসব জায়গায় ফিজিওথেরাপি নিলে আপনি ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারেন।
তাছাড়া প্রশিক্ষণ ছাড়া নিজে নিজেও কোনো ধরনের থেরাপি নেবেন না বা প্রশিক্ষিত বিহীন কারো কাছে বা কোন ফিজিওথেরাপি সেন্টারে চিকিৎসা সেবা নিবেন না। এতে হিতে বিপরীত হওয়ার আশংকা রয়েছে।
সম্প্রতি বিভিন্ন গবেষণায় বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, অবৈজ্ঞানিকভাবে শরীরে চাপ অর্থাৎ ম্যানিপুলেশন দিলে শরীরে রক্ত ও অন্য নালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অন্যদিকে ব্যায়ামের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে।
যেমন : কোমর ব্যথার কারণ স্পন্ডাইলোসিসেস এর ক্ষেত্রে যে ধরনের ব্যায়াম প্রয়োজন স্পন্ডাইলোলিয়েসথেসিসে এর বিপরীতধর্মী ব্যায়াম প্রয়োজন। একইভাবে যে ব্যায়াম কাঁধ ব্যথার কারণ ফ্রোজেন শোল্ডার ভালো করবে সে ধরনের ব্যায়াম শোল্ডার ইমপিনজমেন্ট রোগীকে করালে তা হিতে বিপরীত হবে।
তাই রোগ নির্ণয় করে সে অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে রোগীদের আরও সচেতন হতে হবে। ফিজিওথেরাপি একটি বিজ্ঞানসম্মত গবেষণালব্ধ চিকিৎসা পদ্ধতি। তাই এ চিকিৎসা নেওয়ার আগে অবশ্যই জেনে নিতে হবে, ফিজিওথেরাপি সেন্টারটিতে কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন কি-না।
যে কোনো ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা নেওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ও পরামর্শক্রমে চিকিৎসা নিন ও ঝুঁকিমুক্ত থাকুন। এক্ষেত্রে রোগীদের জেনে রাখা ভালো, শুধু ফিজিওথেরাপি চিকিৎসকরাই আপনার কী ধরনের চিকিৎসা লাগবে তা নির্ধারণ করতে পারে; কোন হাঁটুড়ে ডাক্তার নয়।
১৭। বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপি যেখানে পড়বেনঃ
বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালে সর্বপ্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদের অধীনে আরআইএইচডি-তে (বর্তমানে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ট্রমাটোলজি অ্যান্ড অর্থোপেডিক রিহ্যাবিলিটেশন- নিটোর) ফিজিওথেরাপি বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি প্রদান করা শুরু হয়। এছাড়াও বর্তমানে সিআরপি, গণবিশ্ববিদ্যালয়, পিপলস ইউনিভার্সিটি, স্টেট কলেজ অব হেলথ সাইন্সেসসহ মোট ৭টি প্রতিষ্ঠানে ফিজিওথেরাপি বিষয়ে স্নাতক পর্যায়ে কোর্স চালু আছে।
🎂নিটোর : সরকারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ট্রমাটোলজি অ্যান্ড অর্থোপডিক রিহ্যাবিলিটেশন- নিটোরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদের অধীনে ৪ বছর মেয়াদী ‘বিএসসি ইন ফিজিওথেরাপি’ কোর্স চালু আছে। স্নাতক পর্যায়ের এই কোর্সে ভর্তি হতে চাইলে প্রার্থীকে অবশ্যই জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন বিষয়সহ উচ্চমাধ্যমিক বা সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। এসএসসি ও এইচএসসিতে মোট ন্যুনতম ৭ পয়েন্ট থাকতে হবে। তবে এসএসসি ও এইচএসসির প্রত্যেকটিতে আলাদাভাবে ৩ পয়েন্ট থাকতে হবে।
স্নাতকোত্তর পর্যায়েও পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে এখানে। ওয়েবসাইট : nitorbd.org
🎂সিআরপি : দ্য সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইসড তথা সিআরপির অধীনে বাংলাদেশ হেলথ প্রফেশনস ইনস্টিটিউটে (বিএইচপিআই) স্নাতক এবং ডিপ্লোমা দুই পর্যায়েই ফিজিওথেরাপি বিষয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে। স্নাতক প্রোগ্রামগুলো সাভারে এবং ডিপ্লোমা প্রোগ্রামগুলো মিরপুর ক্যাম্পাসে পরিচালিত হয়। স্নাতক প্রোগ্রামগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এবং ডিপ্লোমা কোর্সগুলো বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা অনুষদের অধীন পরিচালিত হয়। স্নাতক এবং ডিপ্লোমা দুই বিষয়েই ভর্তির ন্যূনতম যোগ্যতা উচ্চ মাধ্যমিক বা সমমান।
ভর্তির প্রক্রিয়া
প্রতিবছর মেডিকেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তির পরপরই বিএইচপিআইতে ভর্তি-প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিএসসি কোর্সের জন্য নভেম্বর-ডিসেম্বর আর ডিপ্লোমা কোর্সের জন্য জুলাই আগস্টে ভর্তি-প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ভর্তি বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত কেন্দ্র থেকে ফরম পূরণ করে জমা দেওয়ার পর লিখিত ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। লিখিত পরীক্ষায় নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের ডাকা হয় মৌখিক পরীক্ষায়। তবে এই প্রক্রিয়া শুধু বিএসসিতে পড়তে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের জন্য। ডিপ্লোমা কোর্সে শুধু মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়।
ওয়েবসাইট : www.crp-bangladesh.org/educational-institute
🎂গণবিশ্ববিদ্যালয় : ঢাকার সাভারে অবস্থিত গণবিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিওথেরাপি বিষয়ে ইন্টার্নশিপসহ ৫ বছর মেয়াদী স্নাতক এবং ২ বছর মেয়াদী স্নাতকোত্তর কোর্স চালু আছে। স্নাতক পর্যায়ে অধ্যয়নের ন্যূনতম যোগ্যতা উচ্চমাধ্যমিক এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ন্যূনতম যোগ্যতা এমবিবিএস অথবা বিএসসি ইন নার্সিং অথবা ফিজিওথেরাপি বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি।
ওয়েবসাইট : www.gonouniversity.edu.bd/physiotherapy/
🎂স্টেট কলেজ অব হেলথ সাইন্সেস : ঢাকায় অবস্থিত স্টেট কলেজ অব হেলথ সাইন্সেস-এ স্নাতক পর্যায়ে বিএসসি ইন ফিজিওথেরাপি বিষয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে।
🎂ফিজিওথেরাপির উপর পোস্টগ্র্যাজুয়েট কোর্স পরিচালিত হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটির অধীনে।
১৮। ফিজিওথেরাপি পড়ার খরচঃ
ফিজিওথেরাপি পড়ার খরচ কেমন – এ প্রশ্ন অনেকেই করেন। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অনেক কম খরচ পড়বে বিএইচপিআইতে পড়তে গেলে। এখানে চার বছর মেয়াদি বিএসসি কোর্সে সর্বমোট খরচ পড়বে আনুমানিক দুই লাখ ৪৮ হাজার টাকা। পঞ্চম বছর থাকবে ইন্টার্নশিপের জন্য, যেখানে শিক্ষার্থীকে মাসভিত্তিক বেতন দেওয়া হবে। ডিপ্লোমা কোর্সে তিন বছরে মোট খরচ পড়বে প্রায় এক লাখ তিন হাজার টাকা, যা শিক্ষার্থীরা মাসিক এক হাজার ৫০০ টাকা করে দিতে পারবেন।
তবে, আমাদের কথা হলো, দেশে যোগ্যতা সম্পন্ন ফিজিওথেরাপিস্টের রয়েছে যথেষ্ট অভাব। তাই আপনি যদি দেশ ও জাতীর সেবা করতে চান এবং নিজেও সম্মানের সাথে বেঁচে থাকতে চান, তাহলে আপনি ফিজিওথেরাপি এ পেশায় লেখা-পড়া করতে পারেন। বর্তমান অবস্থায় ইনশা’আল্লাহ আপনাকে বেকার থাকতে হবে না।
প্রবন্ধটি লিখেছেনঃ আরিফ উল্যাহ চৌধুরী, ম্যানেজার, কমিশনার জয়নাল আবেদীন পৌর রোটারী ইন্টাঃ ফিজিওথেরাপি সেন্টার, লিবার্টি পৌর সুপার মার্কেট, ফেনী পৌরসভা, ফেনী, বাংলাদেশ। (তথ্যসূত্রঃ দ্যা ইন্টারনেট)
এ পোস্টের ট্যাগসমূহঃ ফিজিওথেরাপি ও এর বিস্তারিত, ফিজিওথেরাপি, ফিজিওথেরাপি অধ্যায়ন, ফিজিওথেরাপি শিক্ষালয়, ফিজিওথেরাপি শিক্ষা, ফিজিওথেরাপি শিক্ষা খরচ, physiotherapy, physiotherapy education, physiotherapy patient
রোগের ক্যাটাগরি ওয়াইজ ফেনী শহরের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের চেম্বার লোকেশন সমূহ জানতে-
আবার দৈনিক চাকুরির খবরা-খবর পেতে-
এছাড়া শুদ্ধরুপে কোরআন তিলাওয়াত শিখতে চাইলে-
#ফিজিওথেরাপি #Physiotherapy #what is Physiotherapy


0 Comments